স্কুটার গফুর

 

স্কুটার গফুর
স্কুটার গফুর

ছোটো খাটো দেহ কিন্তু দৌড়ে ছিলেন অদম্য। পায়ে বল পেতেই ক্ষিপ্রতা নিয়ে ছুটে যেতেন প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে। তবে নিজে গোল করে নয়, আনন্দ পেতেন তার পাস দেয়া বল থেকে দলের স্ট্রাইকার গোল পেলে।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে একযুগেরও বেশি সময় ঢাকার ফুটবলের আসর মাতানো প্রাক্তন এ ফুটবলারের নাম আব্দুল গফুর ভুইয়া। তবে ফুটবলের জগতে তার পরিচিতি স্কুটার গফুর নামেই।

জনশ্রুতি রয়েছে, মাঠে বল নিয়ে দৌড়াতেন তৎকালীন ঢাকার রাজপথের নির্ভরযোগ্য যানবাহন স্কুটারের গতিতে। ফুটবলপ্রেমীরা তাই তার নামের আগে সংযোজন করেছিলেন স্কুটার শব্দটি।

ছিলেন বরাবরই লেফট আউটের খেলোয়াড়। ফুটবলকে পায়ের কারুকাজে ঘুরিয়ে পেচিয়ে প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের সামনে নিজ দলের খেলোয়াড়দের কাছে সহজভাবে উপস্থাপনে ছিলেন বেশ পটু। আর তার কর্ণার কিকের তো কোনো তুলনা হয় না। তাতে ছিল অবিশ্বাস্য মুন্সিয়ানা। কর্ণার কিক থেকে সরাসরি গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন বহুবার। ফুটবলের এমন ক্রীড়া ণৈপুন্য শুধু ঢাকার মাঠেই নয়, দেখিয়েছেন দেশের বাইরেও।

১৯৪৭ সালের ১ জানুয়ারি নরসিংদী সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের দঘরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা আব্দুল গফুর ভুইয়ার সঙ্গে ফুটবলের সখ্য গড়ে উঠে তার শৈশবেই। যদিও বাবা আব্দুল মজিদ ছিলেন ফুটবল খেলার চরম বিরোধী। অনেক বাধা সত্ত্বেও বাবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে গ্রামের স্কুল মাঠের ফুটবল খেলার সঙ্গে বেড়ে উঠেন তিনি। পাকাপোক্তভাবে আয়ত্ত্ব করেন কৌশলী ফুটবল খেলার অনেক কিছু। স্থানীয় পর্যায়ের ফুটবল ম্যাচে প্রশংনীয় ক্রীড়া ণৈপুন্য দেখিয়ে ষাটের দশকের শুরুতে তরুণ ফুটবলার হিসাবে সবার নজরে আসেন তিনি। তারপর তার ক্রীড়া ণৈপুন্যের কথা ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে শহরে। শহর থেকে জাতীয় পর্যায়ে। এভাবেই আব্দুল গফুর ভুইয়া দেশের ফুটবলের জগতে হয়ে উঠেন একজন স্কুটার গফুর।

স্কুটার গফুর ১৯৬৪ সালে বিজিপ্রেসে খেলার মাধ্যমে যোগ্যতা অর্জন করেন ঘরোয়া ফুটবল লীগের প্রথম বিভাগে। খেলেছেন রহমতগঞ্জে, দেশসেরা ক্লাব আবাহনীতেও। নামিদামি অনেক ক্লাবের হয়ে দেশের ফুটবল অঙ্গণে দাবড়িয়েছেন একযুগেরও বেশি সময়।

১৯৭০ সালে ইস্ট পাকিস্তানের হয়ে খেলেছেন নেপাল চ্যালেঞ্জ কাপ। সে সময় তার দল জিতেও নেয় সে কাপ। তারপর ১৯৭৪ সালে আবাহনীর হয়ে খেলেছেন কলিকাতা আইএফএ শিল্ড ফুটবল টুর্নামেন্ট। এ টুর্নামেন্টেও আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

সম্প্রতি সাবেক কৃতি এ ফুটবলার দেশের ফুটবল খেলা নিয়ে কথা বলেন সকালের খবরের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগের সে ফুটবল খেলা এখন আর নেই। অযত্ম আর অবহেলায় এ দেশে ফুটবল খেলার প্রায় মৃত অবস্থা চলছে। হতাশার বিষয়, দেশের ফুটবল খেলার প্রতি নতুন প্রজন্মের গুরুত্ত্ব নেই বললেই চলে। আরও হতাশার বিষয়, বর্তমানে ফুটবল খেলা নিয়ে একটি ব্যাপার খুব চলছে। সেটি হলো অনেক খেলোয়াড় ভালো মানের ফুটবল না খেলেও মিডিয়ার বদৌলতে ষ্টার বনে যান। তাদের সময় খেলা নিয়ে এমন ফাঁকিবাজির কোনো সুযোগ ছিল না। তখন গ্যালারীতে বসে খেলা দেখে দর্শকরা খেলোয়াড়ের ভালো মন্দ বিচার করতেন।

নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের কথা স্মরণ করে বলেন তিনি, গোল দেয়ার ক্ষেত্রে ফুটবল তার কাছে বরাবরই ছিল রসগোল্লা আর ক্ষিরমণের মতো লোভনীয়। তবে এ লোভনীয়তা তিনি শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন না। তা তিনি নিজ দলের খেলোয়াড়দের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন।

তিনি বলেন, গোল দেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের সামনে সূবর্ণ সুযোগ সৃষ্টিকারী বলটিই তার কাছে ছিল রসগোল্লা-ক্ষিরমণ স্বরূপ। নিজ দলের স্ট্রাইকারদের কাছে এমন সুযোগ সৃষ্টি করে বল যোগান দেয়ার মধ্যেই তিনি গোলের স্বাদ খোঁজতেন।

প্রসঙ্গত, বয়সের ভারে ন্যূজ্ব প্রাক্তন কৃতি এ ফুটবলার বর্তমানে শারীরিক নানা অসুস্থ্যতা নিয়ে গ্রামের নিজ বাড়িতে ফুটবলের হারানো দিনগুলোর কথা স্মরণ করে দিন কাটাচ্ছেন। তার ৪ ছেলের সবাই ফুটবল খেলার সঙ্গে জড়িত। তৃতীয় ছেলে মোবারক ২০১৩ দেশের সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হন। তিনি বর্তমানে শেখ জামালে খেলছেন।

Source : http://www.shokalerkhabor.com

Add a Comment